নিভৃতে শুনি প্রকৃতির কান্নার সুর — নারায়ণ সরকার

Date:

Share post:

 

পৃথিবীর মানুষ এখন করোনাভাইরাসের আতন্কে গৃহবন্দি। আর সেই সুযোগেই যেন প্রকৃতি ডানা মেলে চলেছে। বিকশিত করছে ফুল-ফল-লতাগুল্ম বৃক্ষরাজি। এতোদিন মানুষগুলো কি প্রকৃতির বিকাশের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল?

আজ গোটা পৃথিবী যখন কাবু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি ভাইরাসের চোখ রাঙানিতে। তখন আপন খেয়ালে আবার নিজেকে একটু গুছিয়ে নিচ্ছে প্রকৃতি। মানুষের অত্যাচারে একটু ওলটপালট হয়ে যাওয়া, বাতাসে অনেকটা দূষণ বেড়ে যাওয়া, আন্টার্টিকার বরফ গলে যাওয়া, বেড়ে যাওয়া জলস্তর, কমে যাওয়া সবুজ, ফিকে হয়ে যাওয়া অক্সিজেন; সবটাই আবার একটু একটু করে সাজিয়ে নিচ্ছে প্রকৃতিমাতা। এ যেন তাঁর নিজের ঘর সাজানো। নিস্তেজ হয়ে যাওয়া শহরগুলোতে আজ বিনা বাঁধায় নিশ্চিন্ত মনে হেঁটে বেরাচ্ছে বানর, হরিণ, নীলগাই, ক্যাঙ্গারু, সজারু, হাতি, বাঘ সহ নানান প্রাণিকূল। পাখিরা আনন্দে গাছের শাখায় দোল খাচ্ছে। ফুলেরা হাসছে। পরিস্কার আকাশে আরো বিশুদ্ধ বাতাসে প্রাণভরে শ্বাস নিচ্ছে সকলে। সমুদ্রে ডলফিন খেলা করছে নির্ভয়ে। নদ-নদীর জল পরিস্কার হতে শুরু করছে। এসব দৃশ্য ভাবলে মন ভাল হয়ে যায়।

জলের কথাই যদি বলি- এই মহাবিশ্বে পৃথিবীই একমাত্র জল ও অক্সিজেন সমৃদ্ধ গ্রহ। এখানে চার ভাগের তিন ভাগই জল। এই জলের ৯৭ শতাংশ সমুদ্র। দুই শতাংশ দুই মেরুতে বরফবন্দি। বাকি এক শতাংশের ০.৬% শতাংশ জল নদী, খাল, বিল, হাওর, বাওড়, পুকুর, দীঘি, হ্রদ প্রভৃতি জলাশয়ে সংগৃহীত। বাকি ০.৪% শতাংশ ভূ-গর্ভস্থ। আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রসংঘের জল বিষয়ক বিশ্ব সম্মেলনের এক প্রতিবেদনে বলেছে -” যদি সারা বিশ্বের জলকে আধা গ্যালন বোতলে রাখা যায়, তা হলে পরিশ্রুত জলের পরিমাণ হবে আধা চা চামচের সমান”।

প্রকৃতির বন, মাঠ, আদিগন্ত প্রান্তর ছিল শিশুর প্রাণচাঞ্চল্য ও প্রবীণের মুক্ত বায়ু সেবনের সহজ স্বাভাবিক উৎস কিংবা উৎপাদনের অমূল্য উপকরণ। সেখানেও ভূমি সওদাগরদের নজর পড়েছে। প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে অতি উচ্চবিত্ত কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া অধিকার। প্রকৃতির আদি ও অবিনশ্বর দান জল, জমি তাও আজ এই নতুন সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে। জমির উপর, জলের উপর যে সকলের মৌলিক অধিকার। প্রতিটি মানুষ যে রাষ্ট্রের কাছে পরিশ্রুত পানীয় জল প্রত্যাশা করতে পারে, জমির উপর আশ্রয় প্রত্যাশা করতে পারে, সেটাও আজ হাজার প্রশ্নের সম্মূখীন।

আজ থেকে প্রায় দুইশত পঞ্চান্ন বছর পূর্বে প্রকৃতির চেহারা ছিল ভিন্ন। মানুষ ছিল সম্পূর্ণ প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। তারা প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা করেছে, বৃক্ষরাজিকে মাতৃজ্ঞানে ভক্তি করে সহাবস্থান করেছে। ১৭৬৫ সালে স্টীম ইঞ্জিন অাবিস্কারের মধ্য দিয়ে শিল্প বিপ্লব শুরু। সেই থেকে পৃথিবীতে একদিনের জন্যেও থামেনি কলকারখানার ইঞ্জিন। আজ প্রকৃতি যেন মানুষকে জোর করে, ভয় দেখিয়ে বেকায়দায় ফেলে বন্ধ রেখেছে মিল ইন্ডাস্ট্রি। মানুষকে করেছে গৃহবন্দি।

কার্ল মার্ক্স বলেছিলেন, পুঁজিবাদ সুযোগ পেলে জল এবং বাতাসকেও মুনাফা সৃষ্টির কাজে লাগাবে! উৎপাদন ব্যবস্থা (System of Production) ছাড়া উৎপাদনের উপাদানগুলোর মধ্যেকার সম্পর্ক (Relation of Production) তাঁর অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয় ছিল। কিন্তু বাজার এবং পুঁজি বড় নিষ্ঠুরভাবে আবেগ-নিরপেক্ষ। তাই জ্ঞানপাপী মানুষের লাগামহীন- মাত্রাহীন লোভ সাধারণ ও দূর্বল মানুষের পরিবেশের উপর থেকে স্বাভাবিক অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। আমরা প্রতিদিন হারিয়ে ফেলছি জমি, জল, জলাশয়, জঙ্গল, নির্মল বাতাসের মতো উপকরণগুলো। পরিবেশ অর্থনীতির ভাষায় হারিয়ে যাচ্ছে Common property resource – এর উপর মানুষের অধিকার।

প্রকৃতি যেন বলছে মানুষেরে-‘মাইরা ভালোবাসামু’ তোরে।
প্রকৃতির গায়ের সবুজ কাপড় মানুষ আস্তে অাস্তে খুলে ফেলেছে। পুঁজি নামক দুঃশাসন প্রকৃতিরূপী দ্রুপদীর বস্ত্রহরণে উন্মত্ত। আর আমরা সাধারণ মানুষগুলো পান্ডবদের মতোই অসহায় দর্শক। দুঃশাসনকে নিরস্ত করা আমাদের সাধ্যাতীত। পুঁজির ধর্মই লাভ করা। লাভের জন্য সে শুধু প্রকৃতিকেই শোষণ করে না, মানুষকেও শোষণ করে। মানুষ শোষণমুক্ত সমাজ তৈরি করতে গিয়ে শেষপর্যন্ত পুঁজির কাছেই হার মানল। কার্ল মার্ক্স পৃথিবীর মানুষদেরকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন সাম্যবাদী সমাজের। অর্থাৎ কমিউনিজমে মানুষ কর্তৃক মানুষ শোষণ এবং মানুষ কর্তৃক প্রকৃতি শোষণের অবসান। তাতে পুৃঁজির বিলুপ্তি ঘটবে। কিন্তু ঐতিহাসিক বস্তুবাদের পথপরিক্রমায় যেটুকু সময় প্রয়োজন তা আমাদের হাতে নেই। মুক্তবাজার অর্থনীতি নামে পুঁজিতন্ত্র সভ্যতার যে বিশাল ও দূর্ভেদ্য কাঠামো নির্মাণ করেছে এবং তা রক্ষার জন্য পারমানবিক বোমাসহ যেসব অস্ত্রশস্ত্র মজুদ করেছে তার কোন মৌলিক সংস্কার বা রূপান্তর সঙ্ঘটিত করা অসম্ভব। এক্ষেত্রে মানুষকে শুভবুদ্ধির আহ্বান করা কতটুকু সমীচীন, সে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়।

পরিবেশবিজ্ঞানী নিসর্গবিদ প্রকৃতিপ্রেমিক দ্বিজেন শর্মা বলেছিলেন, “দু’টি সম্ভাবনার কথা -প্রথমত, মজ্জাগত অর্ন্তদ্বন্দ্বে তার ক্ষয়; দ্বিতীয়ত, প্রকৃতির বিপর্যয়জনিত মহাপ্রলয়।” প্রথমটি যদি ঘটেই যায়, তাতে একটি অজানা অচেনা সভ্যতা নির্মাণে যেটুকু সময় লাগবে, প্রকৃতি সেটা মঞ্জুর করবে কিনা তা বলা খুব কঠিন। আর যদি দ্বিতীয়টি ঘটে তা’হলে পৃথিবীর জনসংখ্যা ও সভ্যতার সিংহভাগ ধ্বংস হয়ে যাবে। মানুষকে আরেকটি নতুন সভ্যতার বিনির্মাণ করতে হবে। কিন্তু সেই সভ্যতাও যে অতীত সভ্যতার মতো প্রত্নকাঠামোভিত্তিক হবে না তা কে বলতে পারে? বিজ্ঞানীরা তো বলে থাকেন, মানুষের আদিপাপ, স্বার্থপরতা ও প্রতিযোগিতার জিনগত ভিত্তি আছে। যা কিনা ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ প্রক্রিয়ায় আমাদের বংশগতিতে দৃঢ়বদ্ধ। প্রকৃতি ও মানুষের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের বহতা ছন্দ হঠাৎ যখন ভেঙ্গে পড়বে তখন প্রকৃতি নির্ধারকের ভূমিকা গ্রহণ করবে। মানুষকে প্রকৃতি তার বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করবে।

মাঝেমধ্যে মনে হয়- আদিবাসী মানুষগুলো আমাদের মতো সুখে না থাকলেও স্বস্তিতে আছেন প্রকৃতিমাতার কোলে। আমরা নাগরিক জীবনে আতংককে সঙ্গী করে অস্বস্তিতে বসবাস করি। প্রকৃতিকে আজ আমাদের ভাবতে হবে। শুনতে হবে নিভৃতে প্রকৃতির কান্নার সুর। তাই কবিতার সুরে বলবো-
গৃহবন্দি থেকে অন্ধ হয়ে গেলাম
মনের ঘরের দরজা গেলো খুলে
খোলা চোখের শতেক জটিলতা
বাইরে যাওয়ার রাস্তা গেছি ভুলে…..।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_img

Related articles

ভালুকায় কাভার্ডভ্যান উল্টে ২জন নিহত

কাভার্ড ভ্যান উল্টে নিহত, ভালুকা, ময়মনসিংহ

ভালুকায় পিকাপ গাড়ীসহ চোর চক্রের ৫ সদস্য আটক 

আফরোজা আক্তার জবা, ভালুকা প্রতিনিধি : ময়মনসিংহের ভালুকায় ২টি চোরাই পিকাপ গাড়ীসহ চক্রের ৫ সদস্যকে আটক করেছে পুলিশ।...

ভালুকায় ধান ক্ষেত থেকে গৃহবধূর গলাকাটা লাশ উদ্ধার

আফরোজা আক্তার জবা ভালুকা প্রতিনিধিঃময়মনসিংহের ভালুকায় হাজেরা খাতুন(৩৫) নামে এক গৃহবধূর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করেছে ভালুকা মডেল থানা...

ভালুকায় পথচারীদের মাঝে পানি ও স্যালাইন বিতরণ

আফরোজা আক্তার জবা, ভালুকা প্রতিনিধিঃ ময়মনসিংহের ভালুকায় প্রচন্ড তাপদাহে মানুষের তৃষ্ণা মেটাতে পথচারীদের মাঝে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার...