অকুতোভয় কমরেড আবদুল হক ও ঐতিহাসিক খাপড়া ওয়ার্ড দিবস অনির্বাণ সেন

Date:

Share post:

পূর্বময় ডেস্ক ঃ   “গুলিতে প্রথম মারা যান কমরেড হানিফ শেখ, তারপর কমরেড আনোয়ার হোসেন। উদ্যত রাইফেলের লক্ষ্যকে উপেক্ষা করে আনোয়ার হোসেন আমাকে এক ধাক্কা দিয়ে বলেন, ‘সরে যাও তোমার বাঁচা দরকার।’ এরপর মুহূতেই একটি বুলেট আমার কপালে সামান্য ক্ষত সৃষ্টি করে আনোয়ার হোসেনের মাথায় লাগে এবং তার মাথা সম্পূর্ণরূপে চুরমার হয়ে যায়। কমরেড সুধীন ধর মারা যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তেও তার সহজ ভাব পরিত্যাগ করেন নি। একটা বিড়ি তাড়াতাড়ি ধরিয়ে তিনি বলেন, সবাই আজ লম্বা বিড়ি ধরাও। আজ আর কারো রক্ষা নেই। এর অল্পক্ষণ পরেই তিনি গুলিতে নিহত হন। কম্পরাম সিংহ মারা যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে বলেন, ‘যাঁরা বেঁচে থাকবে বাইরে গিয়ে তাদেরকে বলো লাল ঝান্ডার সম্মান রেখেই আমরা মারা গেলাম’। পাগলা ঘণ্টী শুনে রাজশাহীর এস.পি ঘটনাস্থলে উপস্থিত না হলে সেদিন আমাদের প্রত্যেককেই মারা যেতে হতো। এস.পি সঙ্গে সঙ্গে সেই নৃশংস হত্যাকান্ড বন্ধ করার আদেশ করলেন। তার বাড়ি ছিল হায়দারাবাদে (ডেকান)। তিনি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে ক্যাপ্টেন ছিলেন সেনাবাহিনীতে। তিনি বলেছিলেন যে, যুদ্ধের সময়ে অনেক মৃত্যু তিনি দেখেছিলেন। কিন্তু অসহায় লোকদেরকে ঘরের মধ্যে গুলি করে মারবার কোন নজির তিনি জানেন না।” – সাপ্তাহিক সেবার প্রকাশিত এক এক্সক্লিউসিভ সাক্ষাতকারে এ কথাগুলি বলছিলেন অকুতোভয় বিপ্লবী কমিউনিস্ট নেতা কমরেড আবদুল হক।

২৪ এপ্রিল ১৯৫০এ গুলিতে যারা মারা যান যারা তারা হলেন- বিজন সেন, কম্পরাম সিংহ, হানিফ শেখ, দেলোয়ার হোসেন, আনোয়ার হোসেন, সুধীন ধর, সুখেন ভট্টাচার্য। আহতদের মধ্যে ছিলেন আবদুল হক, বাবর আলী, আমিনুল ইসলাম, মনসুর হাবিব, ভুপেন পালিত, অমূল্য লাহিড়ী এবং নুরুন্নবী চৌধুরী। গুলিতে আবদুল হকের বাম হাতটি দ্বিখন্ডিত হয়ে যায় এবং মনসুর হাবিবের জানু ও বাহুতে গুলি লাগে। নুরুন্নবী চৌধুরীর পা কেটে ফেলে দিতে হয়। বাকী চারজনও গুরুতর আহত হন। সেদিন যে ৭ জন আহত হয়েছিলেন তারা সেরে ওঠার পর আড়াই বছর তাদেরকে ১৪ নম্বর সেলে তারকাঁটার বেড়ার মধ্যে রাখা হয়েছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের শ্রমিক শ্রেণীর হাতে হিটলারের পতনের মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করে। ফলে সকল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোর নিপীড়িত জাতিগুলি নতুন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে সুসম্পন্ন করার পথে অগ্রসর হতে থাকে। পূর্ব ইউরোপের ৭টি দেশে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে ক্ষমতা দখল করে। ভারতবর্ষের শ্রমিক শ্রেণী ও জনগণ সেদিন পিছিয়ে থাকেনি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালাল সামন্তবাদের বিরুদ্ধে কৃষকদের তেলেঙ্গানা বিদ্রোহ, তেভাগা, টঙ্ক, নানকার আন্দোলনসহ অসংখ্য বিদ্রোহ দানাবেঁধে ওঠে, যা সশস্ত্র রূপে জনগণের প্রতিরোধ আন্দোলনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এরকম একটা প্রেক্ষাপটে সেদিন ব্রিটিশ সাম্রাজবাদ ভারতের সামন্ত-মুৎসুদ্দি শোষক গোষ্ঠীর রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ এই দুই সামন্ত-মুৎসুদ্দিদের হাতে দুটো নয়া ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের শাসনভার অর্পণ করে। যাদের বৈশিষ্ট্য ও চরিত্র হলো সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও দালাল পুঁজির স্বার্থ সংরক্ষিত ও অগ্রসর করা।

১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান যেহেতু জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবরে পরিণতিতে হয়নি, ফলে পাকিস্তানের জনগণের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা হয় না। সমাধান হয় না জাতিগত নিপীড়নের। নয়া কৌশলে ঔপনিবেশিক স্বৈরাচারী ব্যবস্থা থেকে যায় অক্ষত। সেদিন সামন্ত-মুৎসুদ্দি ও অন্যান্য পেটিবুর্জোয়া রাজনৈতিক দলসমূহ একে স্বাধীনতা বলে মেনে নিলেও শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি কমিউনিস্ট পার্টি এই বিভ্রান্তিকে মেনে নেয়নি। তাই ১৯৪৮ সালে ঘোষণা করা হয়েছিল “ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়।” কমিউনিস্ট পার্টি সেদিন জাতীয় গণতাান্ত্রিক বিপ্লবের অসম্পূর্ণ কাজকে অগ্রসর করার আহ্বান জানায়। আর এ কারণে সরকারের তরফ থেকে কমিউনিস্টদের ওপর নেমে আসে চরম আক্রমণ ও নির্যাতন। ঔপনিবেশিক কায়দায় পাকিস্তান সরকার জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ওপর স্বৈরাচারী পন্থায় দমন পীড়ন শুরু করে। হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, গ্রেফতারের বিভীষিকা ছড়িয়ে দেয়। অসংখ্য কমিউনিস্ট বিপ্লবী ও গণতান্ত্রিক কর্র্মীকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করে। আর কারাগারগুলো নিরীহ ও নিরস্ত্র বন্দীদের বিভৎস নির্যাতনের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের উত্তরাধিকার হিসেবে ব্যবহার হতে থাকে। সেদিন জেলখানার ভেতর সকল গণতান্ত্রিক কর্মীরা আধুনিক যুগে কারাবন্দীদের ন্যায্য মানবিক অধিকারের দাবিকে সোচ্চারভাবে তুলে ধরেন। এই দাবির পক্ষে জেলখানায় অনশন আন্দোলন শুর হয়। ৩১, ৪২, ৪৯ এবং ৬২ দিনের অনশন ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়। ৬২ দিনের অনশন ধর্মঘটের ফলে ১৯৫০ সালের এপ্রিলে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে কুষ্টিয়ার কমিউনিস্ট নেতা কমরেড শিবেন রায়ের মৃত্যু ঘটে। আন্দোলনের চাপে জেল কর্তৃপক্ষ বিনাবিচারে আটক রাজবন্দীদের রাজনৈতিক মর্যাদার দাবি স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়। রাজশাহীর জেলবন্দীরাও এই আন্দোলনে সোচ্চার ও গরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারাগারে এই আন্দোলনকারী কারাবন্দীদের শায়েস্তা করার জন্য সরকার নতুন ষড়যন্ত্র আটতে থাকে। রাজশাহী জেলেও নতুন নতুন ষড়যন্ত্র কারাবন্দীদের ওপর চাপানো হতে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে রাজশাহী জেলের রাজবন্দীদের পক্ষ থেকে জেলখানায় বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে জেল কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার প্রস্তাব রাখা হয়। এ প্রেক্ষিতে ইনস্পেক্টর জেনারেল অব প্রিজন্স রাজশাহীতে ভিজিটে আসলে জেলবন্দীদের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব রাখা হয়। কিন্তু আই জি প্রিজন্স আলোচনায় বসার ক্ষেত্রে শর্ত দেয় যে, রাজবন্দীদের ‘ফাইলে’ বসে তাকে ‘সরকারি সালাম’ দিয়ে সম্মান করতে হবে। যার অর্থ হলো বন্দীদের দু’পায়ের ওপর ভর দিয়ে সারিবদ্ধভাবে বসতে হবে একজন জেল সেপাই ‘সরকার সালাম’ বলে ঘোষণা করলে বন্দীরা দাঁড়িয়ে করজোরে হাত তুলে তাকে সালাম দেবে। আইজ প্রিজন্সের এই অমর্যাদাকর প্রস্তাব রাজবন্দীরা প্রত্যাখ্যান করেন।

আইজি পিজন্স পরে বন্দীদের সাথে দেখা করার ও আলোচনার প্রস্তাব গ্রহণ করে। রাজবন্দীদের পক্ষ থেকে আলোচনায় প্রতিনিধি থাকেন কমরেড আবদুল হকসহ ১২ জন প্রতিনিধি। তাদেরকে জেলগেটে দাঁড় করিয়েই আলোচনা শুরু করার চেষ্টা চালায় আইজি প্রিজন্স। কিন্তু জেলবন্দী প্রতিনিধিগণ বসার ব্যবস্থা না হলে আলোচনা করবেন না বলে জানান। ফলে কারা কর্তৃপক্ষ তাদের বসার ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়। প্রতিনিধিগণ জেলখানার ভিতর কারাবন্দীদের ওপর চেপে বসা বিভিন্ন মানবিক সমস্যার কথা তুলে ধরেন। এতে কারা কর্তৃপক্ষ চটে যান। আইজিপি ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিনিধিদের বলে যে, তারা কয়েদির সমস্য নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে কেন ? কিন্তু প্রতিনিধিরা বলেন, গণতান্ত্রিক কর্মী হিসাবে এটা তাদের নৈতিক দায়িত্ব। এই কথায় আইজি প্রিজন আরও চটে যায়। তিনি জেলখানা ত্যাগ করার সময় অর্ডার করে যান এই প্রতিনিধিসহ ১৪ জনকে কনডেম সেলে স্থানান্তরিত করার।

কারা কর্তৃপক্ষের এই অন্যায় হুকুম কারাবন্দীরা মেনে নিতে অস্বীকার করেন। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল কারাবন্দীরা এই সমস্যা নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন ছিলেন। আলোচনায় সভাপতিত্ব করেছিলেন কমরেড হানিফ শেখ। এই আলোচনারত অবস্থায় জেল সুপার মিঃ বিলের নেতৃত্বে ২ জন ডেপুটি জেলারসহ পঁচিশ/ত্রিশ জনের এক বহর খাপড়া ওয়ার্ডে ঢুকে পড়ে। সুপার সরাসরি কমরেড আবদুল হক’র সামনে যেয়ে বলে, “হক, প্রস্তুত হন। আপনাদের কাউকে কাউকে পৃথক করা হবে (Be ready Haque, some of you are to be segregated now)। কমরেড আবদুল হক সঙ্গে সঙ্গে বলেন, বসুন, এ ব্যাপারে আপনার সাথে কথা বলতে হবে (Just sit down please, we have talk with you about this matter.)। সঙ্গে সঙ্গে মিঃ বিল চিৎকার করে ওঠেন, চুপ কর (Shut-up) এই বলে ছুটে তিনি ওয়ার্ডের বাইরে বের হয়ে বাঁশিতে হুইসেল দেয়। আর সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ৪০ জন সেপাই বাঁশের লাঠি নিয়ে কারাবন্দীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কারাবন্দীরা চেষ্টা করতে থাকে আত্মরক্ষার। নিরস্ত্র বন্দীদের ওপর চলতে থাকে এক বিভৎস তান্ডব। কিছুক্ষণ পরেই সেপাইরা খাপড়া ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেয় এবং জানালা দিয়ে সশস্ত্র সেপাইরা রাইফেল তাক করে শুরু করে নির্মম গুলিবর্ষণ।

নিরস্ত্র কারাবন্দীদের ওপর এভাবে গুলিবর্ষণ সকল পৈশাচিক বর্বরতাকেও হার মানিয়ে দেয়। গুলিতে নিহত হন ৭ জন ও আহত হন কমরেড আবদুল হক সহ অসংখ্য কারাবন্দী। কমরেড আবদুল হককে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে তাকে বাঁচানোর জন্য কমরেড আনোয়ার আবদুল হককে ঠেলে সরিয়ে দিলে সেই গুলিতেই কমরেড আনোয়ার শহীদ হন। খাপড়া ওয়ার্ডটি রক্তের স্রোতে ভেসে যায়। এখানেই কারা কর্তৃপক্ষের প্রতিশোধের স্পৃহা মেটে নাই। বিলের নেতৃত্বে আহত বন্দীদের ওপর চালানো হয় আর এক দফা হামলা। বিল হান্টার নিয়ে আহতদের মধ্যে কমরেড আবদুল হককে খুঁজে বের করে সরাসরি তার মাথা লক্ষ্য করে আঘাত করে। কমরেড আবদুল হক তখন হাতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ছটফট করছিলেন। এই আঘাত খাওয়ার পর তার মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ওঠে এবং তিনি অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়েন। রাজশাহীর খাপড়া ওয়ার্ডটিতে ছিলো সেদিন নৃশংসতা ও নিষ্ঠুরতার এক জঘণ্য প্রকাশ। এই বর্বর আক্রমণ ও নৃশংসতা আসলে বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা ছিল না। তাই এ ঘটনার মধ্যে দিয়ে ১৯৪৭ সালের তথাকথিত স্বাধীনতা অর্জনের নামে প্রতারণাপূর্ণ নয়া ঔপনিবেশিক চরিত্রটার মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_img

Related articles

ভালুকায় কাভার্ডভ্যান উল্টে ২জন নিহত

কাভার্ড ভ্যান উল্টে নিহত, ভালুকা, ময়মনসিংহ

ভালুকায় পিকাপ গাড়ীসহ চোর চক্রের ৫ সদস্য আটক 

আফরোজা আক্তার জবা, ভালুকা প্রতিনিধি : ময়মনসিংহের ভালুকায় ২টি চোরাই পিকাপ গাড়ীসহ চক্রের ৫ সদস্যকে আটক করেছে পুলিশ।...

ভালুকায় ধান ক্ষেত থেকে গৃহবধূর গলাকাটা লাশ উদ্ধার

আফরোজা আক্তার জবা ভালুকা প্রতিনিধিঃময়মনসিংহের ভালুকায় হাজেরা খাতুন(৩৫) নামে এক গৃহবধূর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করেছে ভালুকা মডেল থানা...

ভালুকায় পথচারীদের মাঝে পানি ও স্যালাইন বিতরণ

আফরোজা আক্তার জবা, ভালুকা প্রতিনিধিঃ ময়মনসিংহের ভালুকায় প্রচন্ড তাপদাহে মানুষের তৃষ্ণা মেটাতে পথচারীদের মাঝে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার...